বালির উপর কীভাবে তৈরি হল ১৬৩ তলার বুর্জ খলিফা? প্রবল হাওয়াতেও নড়বে না এই ইমারত, জেনে নিন এই অবাক করা বিল্ডিংয়ের চমকে দেওয়া রহস্য! | লেটেস্ট পাঁচমিশালি খবর
মরুভূমির মাটিতে কীভাবে তৈরি করা হল এত মজবুত ভিত?
বুর্জ খলিফা নির্মাণের সময় ইঞ্জিনিয়ারদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এর ভিত তৈরি করা। দুবাইয়ের মাটি বালুকাময়। এত উঁচু একটি ইমারতের ভার বহন করা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে ইঞ্জিনিয়াররা একটি বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্য নেন। ইমারতটির ভিত তৈরির জন্য মাটির গভীরে ১৯২টি মজবুত কংক্রিটের পাইল (Concrete Piles) বসানো হয়। এগুলিকে প্রায় ৪৩ মিটার গভীর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিশেষ বিষয় হল, এই পাইলগুলি কোনও শক্ত পাথরের উপর দাঁড়িয়ে নেই। বরং বালি ও মাটির সঙ্গে ঘর্ষণের মাধ্যমে এগুলি ইমারতের ভার বহন করে।

এই পাইলগুলির উপরে প্রায় ৩.৭ মিটার পুরু কংক্রিটের একটি স্তর তৈরি করা হয়। একে বলা হয় ম্যাট ফাউন্ডেশন। এর কাজ হল ইমারতের বিপুল ওজন ভিতের বিভিন্ন অংশে সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে কোনও একটি জায়গায় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। এইভাবেই মরুভূমির মাটির উপর এত বিশাল একটি ইমারত নির্মাণের পথ তৈরি হয়েছিল।
ওয়াই (Y) আকৃতির নকশা প্রবল হাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে ইমারতটিকে:
ইমারত যত উঁচু হয়, তার উপর হাওয়ার চাপও তত বেশি পড়ে। প্রবল হাওয়া কোনও উঁচু টাওয়ারকে নাড়িয়ে দিতে পারে। বুর্জ খলিফার ক্ষেত্রেও এটি ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। হাওয়ার চাপ যদি ক্রমাগত একই দিকে পড়ত, তাহলে ইমারতটির স্থিতিশীলতা প্রভাবিত হতে পারত। এই সমস্যা মোকাবিলার জন্য এর নকশা ওয়াই (Y) আকৃতির রাখা হয়। এর তিনটি অংশ ইমারতটিকে মজবুতি জোগায়। টাওয়ার যত উপরের দিকে উঠেছে, এর কাঠামোতেও তত পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে হাওয়ার গতিপথ বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং হাওয়ার ঘূর্ণি একই জায়গায় ক্রমাগত প্রভাব ফেলতে পারে না।
এই প্রযুক্তিকে বলা হয় ‘বাট্রেসড কোর সিস্টেম’ (Buttressed Core System)। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ইমারতটির মাঝের অংশটি মেরুদণ্ডের মতো কাজ করে এবং তিন দিকে থাকা অংশগুলি সেটিকে অতিরিক্ত সহায়তা জোগায়। এই নকশার সাহায্যেই বুর্জ খলিফা প্রবল হাওয়ার মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে।
৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রার গরমে কংক্রিট ঢালাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ:
দুবাইয়ে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। এমন প্রচণ্ড গরমে কংক্রিট ঢালাই করা মোটেই সহজ নয়। তীব্র গরমের কারণে কংক্রিট দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে। ফলে তাতে ফাটল ধরার আশঙ্কা থাকে। এমনটা হলে ইমারতটির মজবুতির উপর প্রভাব পড়তে পারত। এই সমস্যা এড়াতে কংক্রিটের সঙ্গে বরফ মেশানো হত, যাতে তার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং সেটি ধীরে ধীরে জমাট বাঁধে।

এছাড়াও, নির্মাণকাজের গতি বজায় রাখতে সেলফ-ক্লাইম্বিং ফর্মওয়ার্ক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। এই প্রযুক্তির সাহায্যে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কাঠামো বারবার ক্রেনের সাহায্যে সরানোর প্রয়োজন হত না। সেটিকে উপরের দিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া যেত। এই ব্যবস্থার কারণেই নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে গিয়েছিল এবং অনেক সময় প্রতি তিন দিনে একটি করে তলের কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।
৬০৬ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল কংক্রিট:
বুর্জ খলিফা নির্মাণের ক্ষেত্রে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কংক্রিটকে এতটা উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া। সাধারণত কোনও ইমারতে কংক্রিট উপরের দিকে নিয়ে যাওয়া সহজ হলেও, উচ্চতা যখন কয়েকশো মিটার হয়, তখন এই কাজ যথেষ্ট কঠিন হয়ে পড়ে। এই ইমারত নির্মাণের সময় বিশেষ পাম্পিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছিল। এর সাহায্যে কংক্রিটকে প্রায় ৬০৬ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়। সেই সময় কংক্রিট পাম্পিংয়ের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি বড় সাফল্য। এতটা উচ্চতায় কংক্রিট পৌঁছে দেওয়ার জন্য যন্ত্রপাতির পাশাপাশি চাপ এবং কংক্রিটের গুণমানের দিকেও বিশেষ নজর রাখতে হয়েছিল।
ক্রেন পৌঁছতে পারেনি, তাই এভাবেই বসানো হয়েছিল ইমারতের স্পায়ার:
বুর্জ খলিফার একেবারে উপরের অংশে লাগানো সূচালো কাঠামোটি ইমারতটিকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে। একে বলা হয় স্পায়ার। এর উচ্চতা এবং অবস্থান এমন ছিল যে সাধারণ পদ্ধতিতে ক্রেনের সাহায্যে এটি বসানো অত্যন্ত কঠিন ছিল। তাই ইঞ্জিনিয়াররা একটি ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেন। স্পায়ারের স্টিলের অংশগুলি ইমারতের ভিতরেই জোড়া লাগানো হয়। এর পর হাইড্রোলিক সিস্টেমের সাহায্যে সেটিকে ধীরে ধীরে উপরের দিকে সরানো হয়। এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা টেলিস্কোপের মতো কাজ করত। এভাবেই ইমারতটির একেবারে উপরের অংশটিও সফলভাবে তৈরি করা হয়।
বুর্জ দুবাই থেকে নাম বদলে বুর্জ খলিফা কেন?
বুর্জ খলিফা সম্পর্কিত একটি আকর্ষণীয় ঘটনা রয়েছে এর নামকরণ নিয়েও। প্রথমে এই ইমারতটির নাম রাখা হয়েছিল বুর্জ দুবাই। কিন্তু ২০১০ সালে উদ্বোধনের সময় এর নাম পরিবর্তন করে বুর্জ খলিফা রাখা হয়। আসলে সেই সময় দুবাই আর্থিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে আবু ধাবির শাসক শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ান দুবাইকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতি সম্মান জানাতেই এই ইমারতটির নাম রাখা হয় বুর্জ খলিফা।
আজ বুর্জ খলিফা শুধু দুবাইয়ের পরিচিতিই নয়, বরং সারা বিশ্বের ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে এক বড় সাফল্যের উদাহরণও। এর মজবুত ভিত, বিশেষ নকশা এবং নির্মাণকাজে ব্যবহৃত আধুনিক প্রযুক্তি প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে কঠিন থেকে কঠিন চ্যালেঞ্জও অতিক্রম করা সম্ভব। মরুভূমির বালির উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই ইমারতটি তার উজ্জ্বল উদাহরণ যে মানুষের কল্পনাশক্তি ও ইঞ্জিনিয়ারিং একসঙ্গে মিলে কত অসাধ্য সাধন করতে পারে।