News

-Ritesh Ghosh

২০০৯ সালের ব্লকবাস্টার ছবি ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর অত্যন্ত জনপ্রিয় চরিত্র ফুনসুক ওয়াংড়ু কি সত্যিই লাদাখের খ্যাতনামা সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের জীবন অবলম্বনে তৈরি? দীর্ঘ দেড় দশক ধরে চলে আসা এই জনপ্রিয় জল্পনায় এবার ইতি টানলেন স্বয়ং বলিউড সুপারস্টার আমির খান। লন্ডনে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের (বিএফআই) একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আমির সাফ জানিয়েছেন, ফুনসুক ওয়াংড়ু চরিত্রটি সোনম ওয়াংচুকের জীবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি। এটি দর্শক মহলের একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা, যা খোদ ওয়াংচুক আগেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

লন্ডনে যখন আমির খান এই বড় বক্তব্য রাখছেন, ঠিক তখনই রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে নিট (NEET) প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আমরণ অনশনে বসেছেন পরিবেশবিদ ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক। সমাজকর্মীর এই চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষিতেই আমির প্রথমবার সংশিষ্ট বিষয়ে মুখ খুললেন। আমির জানান, ফুনসুক ওয়াংড়ুর মতো কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে কোনও প্রকার বাস্তব যোগসূত্র না থাকলেও সোনমের নিজের বহুমুখী কাজ অত্যন্ত শ্রদ্ধার যোগ্য এবং প্রতিটি মানুষের কাছে তা শিক্ষণীয়।

Aamir Khan clarifies Phunsukh Wangdu is not Sonam Wangchuk

আমির খানের এই নতুন বক্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবির অন্য এক অভিনেতার সাম্প্রতিক মন্তব্য। ছবিটিতে ‘চতুর রামলিঙ্গম’ চরিত্রে অভিনয় করা মার্কিন প্রবাসী ভারতীয় অভিনেতা ওমি বৈদ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় সোনমের সমর্থনে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে সোনমের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি পোস্ট করার পাশাপাশি ওমি দাবি করেন যে, ফুনসুক ওয়াংড়ুর চরিত্রটি সোনম ওয়াংচুকের অনুপ্রেরণাতেই রুপোলি পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। ওমির এই দাবিই মূলত ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বিতর্কটিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।

ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের আলোচনা সভায় আমির খান ওমি বৈদ্যর তোলা এই দাবিটি সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ওমি বৈদ্য যা দাবি করেছেন তা আসলে একটি বিভ্রান্তিকর তথ্য। চলচ্চিত্রটি তৈরির সময়ে পরিচালক রাজকুমার হিরানি কিংবা চিত্রনাট্যকার অভিজাত জোশী, কেউই সোনম ওয়াংচুককে চিনতেন না। সোনম নিজেও এর আগে বেশ কয়েকবার বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, এই চরিত্রটি তাঁর জীবনকাহিনি বা তাঁর কাজের কোনও রূপায়ণ নয়।

বাস্তবে সোনম ওয়াংচুক নিজেও তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের সঙ্গে ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবির ফুনসুক ওয়াংড়ুর সরাসরি তুলনা টেনে আনা নিয়ে বেশ কুন্ঠিত। অতীতে একটি টেলিভিশন কুইজ শোতে এসে তিনি এই বিষয়ে নিজের মত প্রকাশ করেছিলেন। সোনম বলেছিলেন যে অনেক মানুষই সিনেমার সঙ্গে তাঁর জীবনকে গুলিয়ে ফেলেন। ছবিটির চিত্রনাট্যে হয়তো তাঁর শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড বা আবিষ্কারের কিছু পরোক্ষ প্রভাব থাকতে পারে, কিন্তু তা কোনওভাবেই তাঁর আসল গল্প নয়।

সোনম বরাবরই মনে করেন যে, ভারতের সাধারণ মানুষ যেন কেবল সিনেমার মোহে পড়ে কোনও বাস্তব আন্দোলন বা কাজকে সমর্থন না করেন। সেলুলয়েডের ফুনসুক ওয়াংড়ুর চেয়ে বাস্তবের মাটির মানুষের লড়াই অনেক বেশি কঠিন ও জটিল। কোনও চলচ্চিত্রের অনুপ্রেরণার তকমা ছাড়াই তাঁর নিজের কাজের পরিচিতি বজায় রাখার মতো ক্ষমতা রয়েছে। আমির খানও সোনমের এই পরিণত দার্শনিক মনোভাবের প্রশংসা করেন এবং সবাইকে সত্যটি উপলব্ধি করার জন্য অনুরোধ জানান।

চলচ্চিত্র ও বিনোদন জগতের এই অন্তহীন জল্পনার সমান্তরালেই রাজধানী দিল্লির প্রাণকেন্দ্র যন্তর মন্তরে চিকিৎসকদের কড়া নজরদারিতে চলছে সোনম ওয়াংচুকের ঐতিহাসিক অনশন। নিট-ইউজি পরীক্ষার অনিয়ম এবং প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে লাগাতার জলস্পর্শ না করে অনশনে বসেছেন তিনি। এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের একটি সংগঠন। দেশের লাখ লাখ পরীক্ষা প্রার্থীর সোনালী ভবিষ্যতের স্বার্থে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর দ্রুত ইস্তফার দাবিতে সরব হয়েছেন তিনি।

আমির খানের দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহ নাগাদ সোনম ওয়াংচুকের এই আন্দোলন প্রায় বিশ দিনে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ অনাহারে থাকার কারণে লাদাখের এই লড়াকু প্রবীণ সমাজকর্মীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবক্ষয় ঘটছে। তা সত্ত্বেও তিনি আন্দোলন থেকে এক ইঞ্চিও পিছু হটতে রাজি নন। দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি বলিপাড়ার এক বড় অংশ তাঁর এই আন্দোলনের দাবির দিকে নজর দিয়েছেন এবং সংহতি প্রকাশ করেছেন।

সোনম ওয়াংচুকের এই অনড় প্রতিবাদের সময় তাঁর স্বাস্থ্যের বিষয়ে আমির খান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আমির স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে এই মুহূর্তে সিনেমার চরিত্র নিয়ে তর্কের চেয়ে সোনমের জীবন অনেক বেশি মহামূল্যবান। সোনমের শারীরিক অবনতির খবর শুনে বলিপাড়ার অনেকেই চিন্তিত। আমির আশা করছেন যে দ্রুত এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসবে এবং সোনম সুস্থ অবস্থায় নিজের অনশন ভাঙবেন।

চলচ্চিত্রের কৃত্রিম জগত এবং বাস্তবের মাটির পৃথিবীর লড়াইয়ের মধ্যে যে এক দুস্তর ফারাক থাকে, আমির খানের এই অকপট বক্তব্য হয়তো তা আরও একবার দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দিল। রুপোলি পর্দার ফুনসুক ওয়াংড়ু সিনেমা শেষে নিজের জয় দেখিয়ে বিদায় নিয়েছিল, কিন্তু লক্ষাধিক পড়ুয়ার জন্য বাস্তবের সোনম ওয়াংচুকের যন্তর মন্তরের লড়াই এখনও এক বড় পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।



Source link

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *