Last Updated:
Bankura News: বাঁকুড়ার চালিবাড়িরডিহি গ্রামে ভূতের ভয় ও গুজবে সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে গেলেও পূর্বপুরুষের ভিটে আঁকড়ে পড়ে রয়েছে মাত্র একটি পরিবার।
নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, বাঁকুড়া: ভূত চতুর্দশীতে বাঁকুড়ার ‘ভূতের গ্রাম’! সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসে নিস্তব্ধতা, গোটা গ্রামে বসবাস মাত্র একটি পরিবারের ৷
আজ, শনিবার ভূত চতুর্দশী। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে নাকি অশুভ শক্তির আনাগোনা বাড়ে। সন্ধ্যা নামলে চারপাশে জ্বলে ওঠে চোদ্দো প্রদীপ, আর ভূত-প্রেতের গল্পে জমে ওঠে আড্ডা। কিন্তু বাঁকুড়ার এমন একটি গ্রাম রয়েছে, যেখানে ভূতের গল্প শুধু একটি রাতের কল্পনা নয়, বরং গ্রামের পরিচয়ের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে। গ্রামের নাম চালিবাড়িরডিহি। লোকমুখে পরিচিত ‘ভূতের গ্রাম’ হিসেবে। একসময় যেখানে ছিল মানুষের বসতি, ঘরবাড়ি, সংসার, সেখানে এখন জনমানবহীন পরিবেশ। গোটা গ্রামে বসবাস করে মাত্র একটি পরিবার। সন্ধ্যা নামলেই চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়, একসময় ভরা সংসার ছিল এই গ্রামে। কিন্তু ভয়াবহ এক মহামারিতে গ্রাম প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। তারপর থেকেই ছড়িয়ে পড়ে নানা অলৌকিক কাহিনি। লক্ষ্মণ বাউড়ির বাবা দক্ষিণ বাউড়ির চাষবাস ছিল এই গ্রামেই। সেই সূত্রেই দীর্ঘদিন বাইরে থাকার পর আবার পূর্বপুরুষের ভিটেতে ফিরে আসেন লক্ষ্মণ। ১৯৮২ সালে পরিত্যক্ত গ্রামে নতুন করে বসতি গড়েন তিনি। পরবর্তীকালে আরও ১৫টি পরিবার সেখানে থাকতে শুরু করে। কিন্তু প্রায় এক দশক আগে একটি শিশুহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। ভূতের গুজবে একে একে গ্রাম ছেড়ে চলে যান বাসিন্দারা। তবে স্ত্রী রিনা বাউড়ি ও তিন সন্তানকে নিয়ে থেকে যান লক্ষ্মণ। তাঁর কথায়, সন্ধ্যার পর নানা ধরনের শব্দ শোনা গেলেও পূর্বপুরুষের ভিটে ছেড়ে যেতে চান না তাঁরা।
তবে ভূতের গ্রাম বলে পরিচিত হলেও প্রশাসনিক পরিষেবা থেকে বিচ্ছিন্ন নয় চালিবাড়িরডিহি। রিনা বাউড়ির কথায়, তাঁদের রেশন মেলে, গ্রামে বিদ্যুৎ রয়েছে, কোনও বড় অসুবিধা হয় না। ভোটের সময় বরজুবুড়ি গ্রামে বুথ তৈরি হয়, সেখানেই গিয়ে ভোট দেন তাঁরা। পাঁচজনের সংসারে বড় ছেলে সুরজ বাউড়ি বর্তমানে মহারাষ্ট্রের একটি সংস্থায় কর্মরত। লক্ষ্মণ নিজে চাষবাস করেন। দ্বিতীয় ছেলে শুভদীপ গঙ্গাজলঘাটি হাই স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র এবং মেয়ে বৃষ্টি গোবিন্দ প্রসাদ মহাবিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া। তিন ভাইবোনেরই প্রাথমিক শিক্ষার শুরু এই গ্রামের স্কুলে। সুরজের দাবি, এখনও গ্রামের স্কুলে পঠনপাঠন হয়, শিক্ষকও রয়েছেন। তবে বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর মতো প্রতিবেশী না থাকাটাই তাঁদের বড় আক্ষেপ।
অন্যদিকে, যুক্তিবাদীদের মতে, চালিবাড়িরডিহিতে ভূতের অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ নেই। দীর্ঘদিনের অন্ধবিশ্বাস, মহামারি ও শিশুহত্যার মতো ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া আতঙ্ক থেকেই এই রহস্যময় পরিচয়ের জন্ম। সত্যিই সেখানে অশরীরীর আনাগোনা রয়েছে কি না, তার উত্তর আজও অজানা। কিন্তু ভূত চতুর্দশীর রাতে যখন চোদ্দো প্রদীপের আলোয় ঘর আলোকিত করার প্রস্তুতি চলে, তখন বাঁকুড়ার এই গ্রামে জেগে থাকে অন্য এক বাস্তব। ভয়, নিঃসঙ্গতা আর নানা লোককথার মাঝেও পূর্বপুরুষের ভিটে আঁকড়ে বেঁচে রয়েছে একটি পরিবার। তাই ভূতের অস্তিত্ব থাকুক বা না থাকুক, চালিবাড়িরডিহির রহস্য আজও মানুষের কৌতূহল জাগায়।
