সন্দীপ সরকার, কলকাতা: তিনি তখন দলীপ ট্রফিতে পূর্বাঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। বাংলার ক্রিকেট কর্তারা নিশ্চিত হতে পারছিলেন না যে, রঞ্জি ট্রফির শুরু থেকে মহম্মদ শামি খেলবেন কি না। ডানহাতি ফাস্টবোলারের সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বাংলার কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্লকে। শামি রাজি হয়ে যান খেলতে। দিল্লির বিরুদ্ধে রঞ্জি ট্রফির প্রথম ম্যাচের আগে সরাসরি কল্যাণীর বেঙ্গল ক্রিকেট অ্য়াকাডেমিতে দলের সঙ্গে যোগ দেন। সেই ম্যাচে বল হাতে বাংলাকে জেতাতে বড় অবদানও রাখেন।
রঞ্জি ট্রফি এখন মাঝপর্বে। গ্রুপে চার ম্যাচ খেলা হয়েছে। পরপর তিন ম্যাচ জেতার পর মহারাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হেরে গিয়েছে বাংলা। আর তারপরই টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণা করে দিয়েছেন শামি। অনেককে হতবাক করে দিয়ে। ৩৬ বছর বয়সী ফাস্টবোলার শুক্রবার রাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও পোস্ট করে জানান, ভারতের হয়ে তাঁকে আর কখনও টেস্ট খেলতে দেখা যাবে না। আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণা করেছেন শামি।
কিন্তু কেন আচমকা এই সিদ্ধান্ত? বাংলা শিবিরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শামি যে টেস্ট থেকে অবসর নেবেন, সেই ইঙ্গিত দলের কারও কারও কাছে ছিল। বাংলার কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্ল রঞ্জি ট্রফিতে কেরল ম্যাচের পরই লেখা যাবে না এই শর্তে এবিপি লাইভ বাংলাকে জানিয়েছিলেন, ৬ নভেম্বর টেস্ট থেকে অবসর ঘোষণা করার কথা ভাবছেন শামি। কেন এই দিনটিকেই বেছে নেওয়া? কারণ, ২০১৩ সালে ইডেন গার্ডেন্সে এই তারিখেই টেস্টে অভিষেক হয়েছিল শামির। সচিন তেন্ডুলকরের বিদায়ী টেস্ট সিরিজের ১৯৯তম ম্যাচে ইডেনে বল হাতে তাণ্ডব চালিয়েছিলেন ডানহাতি ফাস্টবোলার। নিয়েছিলেন ৯ উইকেট। আড়াই দিনে শেষ হয়ে গিয়েছিল ম্যাচ। ভারতের একমাত্র ইনিংসে ১৭৭ রান করে ম্যাচের সেরা হয়েছিলেন রোহিত শর্মা। তবে শামির বল হাতে তাণ্ডব এখনও সকলের মনে টাটকা। সেই ম্যাচের পর স্মারক হিসাবে একটি স্টাম্প তুলে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন শামি। টেস্ট থেকে অবসরের জন্য়ও তাই ৬ নভেম্বর বেছে নেন তিনি।
ভারতের হয়ে ৬৪ টেস্টে ২২৯ উইকেট রয়েছে শামির। ব্যাট হাতে ২টি হাফসেঞ্চুরিও করেছেন। তবে ভারতের হয়ে শামি শেষ টেস্ট খেলেছেন তিন বছর আগে। ২০২৩ সালের জুন মাসে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। ওভালে সেই ম্যাচে বিশ্রীভাবে হেরে যায় ভারত। তারপর থেকে আর টেস্টে শামিকে জাতীয় দলে দেখা যায়নি।
চোট-আঘাত ভুগিয়েছে শামিকে। তাঁর হাঁটুতে অস্ত্রোপচারও হয়। তবে ফিরে আসার লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন হাল ছাড়েননি। যদিও কোচ গৌতম গম্ভীর ও প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর তাঁকে নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না বলেই খবর। ফিটনেস নিয়ে তো আগরকর ও শামি প্রকাশ্যে পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করেছেন। বেড়েছে দূরত্ব।
শামি খেলা চালিয়ে গিয়েছেন। ভেবেছিলেন, ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা টেস্ট দলে প্রত্যাবর্তনের রাস্তা তৈরি করে দেবে। এবিপি লাইভ বাংলাকে শামি একাধিকবার বলেছেন, ‘আমার কাজ উইকেট তোলা। সেটাই মন দিয়ে করছি। কেমন বল করছি আপনারা সকলে দেখছেন। বাকি কাজ নির্বাচকদের।’
নির্বাচক কমিটিতে বদল শামিকে ফের নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। আগরকরের প্রস্থান, এক সময়কার সতীর্থ প্রজ্ঞান ওঝার প্রধান নির্বাচক হওয়া বন্ধ দরজা খোলার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল শামির মনে। নিউজ়িল্য়ান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে ভারতীয় দলে ফেরার আশায় বুক বেঁধেছিলেন। যে কারণে উত্তর প্রদেশের আমরোহায় নিজের ফার্মহাউসে প্রাক মরশুম প্র্যাক্টিস চালিয়ে গিয়েছেন।
কিন্তু নিউজ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে উপেক্ষিত হতেই দেওয়াল লিখন পড়তে পেরেছিলেন শামি। যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ সিরাজ, আকাশ দীপ, প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, অংশুল কম্বোজদের সঙ্গে দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছেন। টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থা ফিরে পাননি। মহারাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রঞ্জি খেলার ফাঁকেই এবিপি লাইভ বাংলাকে শামি বলেছিলেন, ‘টেস্ট দল নিয়ে আর ভাবছি না।’ ইঙ্গিত ছিল সেদিনও।
অবশেষে ৬ নভেম্বর ঘোষণা করলেন, লাল বলের ক্রিকেটে আর নয়। এখানেই সমাপ্তি। সৈয়দ মুস্তাক আলি টি-২০ ও বিজট হাজারে ট্রফিতে খেলবেন শামি। রঞ্জি ট্রফির পরের ম্যাচগুলি খেলবেন? শামি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আইপিএলের আগে নিজেকে ম্যাচ ফিট রাখতে খেলতে পারেন। পরের বছর ওয়ান ডে বিশ্বকাপ। সাদা বলের ক্রিকেটে আরও একবার টিম ইন্ডিয়ার জার্সি পরার স্বপ্ন দেখা থামছে না শামির।
আরও পড়ুন: ভারতীয় দলে ফেরার স্বপ্ন দেখেন? ইডেনে বাংলার বিরুদ্ধে মহারাষ্ট্রকে জিতিয়ে কী বললেন পৃথ্বী?
