Last Updated:
Sundarban Culture: সুন্দরবনের গহিন অরণ্য, অজস্র নদী-খাঁড়ি এবং ম্যানগ্রোভের নির্জন জগতের সঙ্গে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জড়িয়ে রয়েছে দেবী ‘বনবিবি’র নাম। বিপদসংকুল সুন্দরবনে আজও জঙ্গলজীবীদের ভরসা ও সুরক্ষার একমাত্র পথ লোকদেবী বনবিবি।
বসিরহাট, জুলফিকার মোল্যা: সুন্দরবনের জঙ্গলজীবনের ভরসা বনবিবি, আজও অটুট লোকবিশ্বাস। সুন্দরবনের গভীর অরণ্য, নদী-খাঁড়ি আর ম্যানগ্রোভের বিস্তীর্ণ জগতের সঙ্গে বহুদিন ধরেই জড়িয়ে রয়েছে বনবিবির নাম। মৎস্যজীবী, মধু-সংগ্রহকারী, কাঁকড়া শিকারি ও কাঠুরিয়াদের কাছে বনবিবি শুধু আরাধ্য নন, তিনি জঙ্গলের বিপদ থেকে রক্ষাকারী শক্তির প্রতীক। জীবিকার প্রয়োজনে সুন্দরবনের জলা-জঙ্গলে পা রাখার আগে আজও বহু মানুষ বনবিবির কাছে প্রার্থনা করেন। অরণ্যের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ছোট ছোট বনবিবির থান ও মন্দির সেই দীর্ঘদিনের বিশ্বাসেরই নিদর্শন। লোকাচার ও বিশ্বাসে বনবিবিকে সুন্দরবনের জঙ্গলের অভিভাবক হিসেবে মনে করা হয়।
একদিকে বাঘের ভয়, অন্যদিকে নদী-খাঁড়ির অনিশ্চয়তা, প্রতিনিয়ত নানা ঝুঁকি নিয়েই জঙ্গলে যেতে হয় এখানকার বহু মানুষকে। তাই মাছ, মধু বা কাঁকড়া সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে বনবিবির নাম স্মরণ করা অনেকের কাছেই বাধ্যতামূলক রীতির মতো। বনবিবিকে ঘিরে রয়েছে সুন্দরবনের অন্যতম পরিচিত লোককাহিনি, দুখের কাহিনি। কথিত আছে, এক দরিদ্র বিধবা তাঁর ছেলে দুখেকে নিয়ে একটি প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করতেন। সেই সময় ধনা ও মনা নামে দুই জঙ্গলজীবী মধু সংগ্রহের জন্য সুন্দরবনের কেঁদোখালির জঙ্গলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। তাঁদের সঙ্গে দুখেও জঙ্গলে যায়।
যাওয়ার সময় তার মা ছেলেকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, বিপদে পড়লে যেন সে ‘বনের আর এক মা’-কে স্মরণ করে। কাহিনি অনুযায়ী, জঙ্গলে পৌঁছে এক রাতে দক্ষিণ রায় ধনা ও মনাকে স্বপ্নে দেখা দেন। দুখেকে তাঁর কাছে উৎসর্গ করার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে লোকবিশ্বাস। লোভ ও স্বার্থের বশে ধনা ও মনা দুখেকে জঙ্গলে ফেলে রেখে চলে যায়। গভীর অরণ্যে একা ও অসহায় হয়ে পড়ে দুখে তখন মায়ের কথা মনে করে বনবিবিকে ডাকতে শুরু করে। লোককথায় বলা হয়, দুখের সেই আর্তি বনবিবির কাছে পৌঁছয়। তিনি এসে দুখেকে রক্ষা করেন এবং বাঘরূপী দক্ষিণরায়ের হাত থেকে তাকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেন।
শেষ পর্যন্ত দুখে মায়ের কাছে ফিরে আসে। এই কাহিনি শুধু দেব-দেবীর অলৌকিক কাহিনি নয়, এর মধ্যে সুন্দরবনের জঙ্গলজীবী মানুষের ভয়, অনিশ্চয়তা, বেঁচে থাকার লড়াই এবং অদৃশ্য এক আশ্রয়ের প্রতি আস্থার ছবিও ফুটে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সুন্দরবনের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন এলেও বনবিবিকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস এখনও বহু জায়গায় অটুট। জঙ্গলে যাওয়ার আগে বনবিবির নাম নেওয়া, তাঁর কাছে নিরাপদে ফিরে আসার প্রার্থনা করা, আজও অনেক জঙ্গলজীবী পরিবারের জীবনের অংশ। তাই সুন্দরবনের মানুষের কাছে বনবিবি শুধু একটি লোকদেবীর নাম নন, তিনি বিপদসংকুল অরণ্যে সাহস, ভরসা ও আশ্রয়ের প্রতীক।
