আসলে দিল্লির চড়া বাড়ি ভাড়া এবং প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে শ্বেতা মানালিতে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেখানে মাসে মাত্র ৫ হাজার টাকায় একটি ঘর পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অথচ দিল্লিতে একা থাকার জন্য তাঁকে মাসে ১৮ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হত। প্রথম দিকে মানালির মনোরম উপত্যকা এবং শান্ত পরিবেশ তাঁর মন জয় করে নিয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর কাজ সংক্রান্ত সমস্যা এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব তাঁর কাছে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত মানালি ছেড়ে তাঁকে আবার দিল্লিতে ফিরে আসতে হয়। এখন তাঁর এই অভিজ্ঞতা সেই সমস্ত মানুষের কাছে একটি শিক্ষা হয়ে উঠেছে, যাঁরা শহর ছেড়ে পাহাড়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার স্বপ্ন দেখেন।
প্রথম দেখাতেই মানালির প্রেমে পড়েন, দেরি না করে দিয়ে দেন অগ্রিম টাকা:
দিল্লি ছেড়ে মানালিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শ্বেতা নিয়ে ফেললেও সেখানে থাকার জন্য বাড়ি খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না। মানালিতে পৌঁছনোর পর পরিচিতদের সাহায্যে একটি ঘরের সন্ধান পান তিনি। প্রথমবার সেই ঘরে ঢুকেই সেখানকার পরিবেশ দেখে বেশ খুশি হয়ে যান। জানলা দিয়ে সূর্যের কমলা রঙের আলো ঘরের ভিতরে এসে পড়ছিল এবং সামনের গাছগুলি হাওয়ায় দুলছিল। চারপাশের পরিবেশ এতটাই মনোরম ছিল যে তাঁর মনে হয়েছিল, যেন কোনও রোম্যান্টিক সিনেমার অংশ হয়ে গিয়েছেন তিনি। ঘরটি দেখেই তাঁর জায়গাটি পছন্দ হয়ে যায় এবং বেশি চিন্তাভাবনা না করেই অগ্রিম টাকা দিয়ে দেন।
এরপর জিনিসপত্র নিয়ে মানালিতে পৌঁছনোর প্রস্তুতি শুরু হয়। যদিও এখানেও শহরের মতো সুযোগ-সুবিধা পাননি তিনি। দিল্লিতে জিনিসপত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য একাধিক অনলাইন প্যাকার্স অ্যান্ড মুভার্স পরিষেবা থাকলেও মানালিতে সেই ব্যবস্থা করা সহজ ছিল না। অনেক চেষ্টা করার পর একজন সহায়তাকারী গাড়িচালকের সন্ধান পান তিনি। তাঁর সাহায্যেই প্রায় ১৬-১৭ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা পেরিয়ে মানালিতে পৌঁছন শ্বেতা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, যেদিন তিনি সেখানে পৌঁছেছিলেন, সেদিনই শুরু হয়ে গিয়েছিল প্রবল তুষারপাত।
৫ হাজার টাকা ভাড়ায় মিলেছিল বাড়ি, প্রথম দিকে জীবন মনে হয়েছিল স্বর্গের মতো:
মানালিতে শুরুর দিনগুলি শ্বেতার কাছে কোনও স্বপ্নের চেয়ে কম ছিল না। দিল্লিতে যেখানে একা থাকার জন্য তাঁকে প্রতি মাসে ১৮ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া দিতে হত, সেখানে মানালিতে মাত্র ৫ হাজার টাকায় একটি ঘর পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। বাড়ি ভাড়ায় এতটা টাকা সাশ্রয়ের পাশাপাশি তিনি পাচ্ছিলেন শান্ত পরিবেশ এবং মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য। সেখানে সকালে অ্যালার্মের শব্দে নয়, বরং পাখির কিচিরমিচিরে ঘুম ভাঙত তাঁর। চারপাশে ছিল গাছপালা এবং চোখের সামনে দেখা মিলত টাটকা ফলের। কল থেকে জল পাওয়া এবং প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে বেশ ভালো লাগত তাঁর। ধীরে ধীরে মোবাইল ফোনে সময় কাটানোর অভ্যাসও কমতে শুরু করে এবং বই পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। শহরের দ্রুতগতির জীবন থেকে দূরে এসে তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি একেবারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু প্রথম দিকে যে বিষয়গুলি তাঁকে স্বস্তি দিচ্ছিল, কিছুদিন পর সেই পাহাড়েই বসবাসের নানা চ্যালেঞ্জ সামনে আসতে শুরু করে।
কাজের চাপ বাড়তেই সামনে আসতে শুরু করে পাহাড়ে থাকার সমস্যা:
শ্বেতার মানালি ছাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল না সেখানকার সৌন্দর্য, বরং প্রতিদিনের কাজকর্ম করতে গিয়ে নানা সমস্যা। তাঁর wittySpace-এর কাজ দ্রুত বাড়ছিল এবং সেই কাজের সূত্রে তাঁকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশেও যাতায়াত করতে হত। ফলে মানালির প্রত্যন্ত এলাকায় থেকে নিয়মিত যাতায়াত করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল। তাঁর কথায়, সেখানে ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সমস্যা ছিল এবং বারবার বিদ্যুৎ চলে যেত। কাজ অনলাইনে হওয়ার কারণে দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ তাঁর কাছে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও ঠিকঠাক ছিল না। এই সমস্ত সমস্যার মধ্যে কাজ সামলানো এবং বারবার যাতায়াত করা সহজ হচ্ছিল না।
শহরে বসবাসকারী মানুষজন সহজেই অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়ে যান, কিন্তু পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে সেই ব্যবস্থা থাকে না। সেখানে ছোটখাটো প্রয়োজন মেটাতেও অনেক পরিশ্রম করতে হতে পারে। ধীরে ধীরে শ্বেতা বুঝতে পারেন, মানালিতে ছুটি কাটানো এবং সেখানে পাকাপাকিভাবে বসবাস করা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। শেষ পর্যন্ত ভারাক্রান্ত মনেই দিল্লিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
পাহাড়ে বসবাস শুরু করার আগে নিজেকে করুন এই দুটি প্রশ্ন:
নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শ্বেতা শহর ছেড়ে পাহাড়ে বসবাস করার পরিকল্পনা করছেন, এমন মানুষদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথম বিষয়টি হল, পাহাড়ে যাওয়ার পরেও আপনার কাজ এবং উপার্জন কি আগের মতোই চালিয়ে যেতে পারবেন? আপনার কাজ যদি ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ কিংবা বারবার যাতায়াতের উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সেখানে কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, সে সম্পর্কে আগে থেকেই তথ্য সংগ্রহ করে নেওয়া জরুরি।
দ্বিতীয় বিষয়টি হল, আপনি সত্যিই কি সারা জীবন পাহাড়ে কাটাতে চান, নাকি আপনার শুধু কয়েক দিনের ছুটির প্রয়োজন? অনেক সময় পাহাড়ে ১০-১৫ দিন কাটাতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু সেখানে প্রতিদিনের জীবনযাপন করার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের মতামতও জানালেন নেটিজেনরা:
শ্বেতার অভিজ্ঞতা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরাও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কয়েকজনের বক্তব্য, সোশ্যাল মিডিয়ায় পাহাড়ে বসবাসের সুন্দর সুন্দর ছবি দেখে মানুষ বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলি সম্পর্কে ভাবেন না।
একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ইন্টারনেটে সবাইকে বালি, গোয়া কিংবা হিমাচলে চলে যেতে দেখে অনেকেই FOMO অর্থাৎ কিছু একটা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভুগতে শুরু করেন।”
অন্য এক ইনস্টাগ্রাম ইউজার লিখেছেন, “পর্যটকদের পক্ষে কোনও পাহাড়ি জায়গায় এক সপ্তাহ কিংবা ১০ দিন কাটানো সহজ। কিন্তু সেখানে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, কর্মসংস্থান এবং বাড়িতে জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়ার মতো পরিষেবার অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে হয়।”
উত্তরাখণ্ডের এক স্থানীয় বাসিন্দা নিজের ছোটবেলার অভিজ্ঞতা ভাগ করে লিখেছেন, “সেখানে সুযোগ-সুবিধার অভাব থাকলেও তাঁদের প্রয়োজন ছিল সীমিত। তাই সেই পরিবেশে তাঁরা থাকতে পেরেছেন। কিন্তু শহরের সুযোগ-সুবিধায় অভ্যস্ত মানুষদের পক্ষে স্কুল কিংবা বাজারে যাওয়ার জন্য প্রতিদিন ৮ কিলোমিটার হেঁটে যাওয়া বেশ কঠিন হতে পারে।”
অন্যদিকে, এক নেটিজেন নিজের প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, “পাহাড় দূর থেকেই দেখতে ভালো লাগে।”
