মনোবিজ্ঞানে, নিজের সঙ্গে কথা বলাকে স্ব-কথন বা অভ্যন্তরীণ কথোপকথন বলা হয়। এটি দুই প্রকারের হতে পারে: অভ্যন্তরীণ স্ব-কথন। এর অর্থ হল মনে মনে নিজের সঙ্গে কথা বলা। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যখন ভাবেন যে আপনার চাবি কোথায় রেখেছেন, তখন এটি অভ্যন্তরীণ স্ব-কথন। যখন আপনি একই কথা মুখে বলেন, তখন তাকে বাহ্যিক স্ব-কথন বলা হয়। স্ব-কথনের উপর গবেষণা দেখায় যে বেশিরভাগ মানুষ দিনে একাধিকবার নিজের সঙ্গে কথা বলে এবং অনেকেই ক্রমাগত তা করে থাকে।
রুশ মনোবিজ্ঞানী লেভ ভাইগটস্কি এই তত্ত্বটি প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁর মতে, শৈশবে যখন আমরা অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা করি, তখন আমরা কিছু শিখি। এই মেলামেশা ধীরে ধীরে আমাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়। আমরা আমাদের ভেতরের কণ্ঠস্বরের মাধ্যমেই চিন্তা করি, পরিকল্পনা করি এবং সমস্যার সমাধান করি। অন্য কথায়, নিজের সঙ্গে কথা বলা মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের মানসিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মতো।
স্মৃতিশক্তি উন্নত করে: ২০১২ সালের একটি গবেষণায়, উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক গ্যারি লুপিয়ান এবং ড্যানিয়েল সুইংলি দেখতে পান যে, যখন মানুষ কোনও বস্তুর নাম বলতে বলতে সেটি খোঁজে, তখন তা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এর মানে হল, যখন আপনি “চাবিগুলো কোথায়?” বলতে বলতে একটি চাবি খোঁজেন, তখন আপনি বস্তুটির উপর আরও বেশি মনোযোগ দেন। খোঁজার সময়, আপনার মস্তিষ্ক এটাও খেয়াল রাখে যে আপনি সেটি কোথায় রেখেছিলেন।
মানসিক চাপ কমায়: মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং মিশিগান ইউনিভার্সিটির গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, যখন একজন ব্যক্তি অন্য কারওর সঙ্গে কথা বলে, তখন তার মানসিক চাপ কমে যায় এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, যদি রাহুল নামের একজন ব্যক্তি নিজেকে বলে, “রাহুল, চিন্তা করো না, ভালো কিছু ঘটবে,” তবে এই স্বগতোক্তি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
খেলাধুলায় উন্নতি: ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানের বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, ইতিবাচক আত্মকথন ক্রীড়াবিদদের পারফরম্যান্স উন্নত করতে পারে। বিশেষ করে কোনও প্রতিযোগিতার আগে, “আমি এটা করতে পারি,” বা “মনোযোগ দাও, তুমি জিতবে,” এই ধরনের আত্মকথন আত্মবিশ্বাস ও একাগ্রতা বাড়াতে পারে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক: যখন মানুষ নিজের সমস্যা নিয়ে নিজের সঙ্গে আলোচনা করে, তখন তারা পরিস্থিতিটিকে একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। কেউ কেউ একে দূরবর্তী চিন্তা বলে থাকেন, যার অর্থ হলো দূর থেকে চিন্তা করা। এমনটা করলে ব্যক্তিরা যেকোনো পরিস্থিতি সম্পর্কে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় এমন কোনও সুস্পষ্ট নিয়ম খুঁজে পাননি যা থেকে বোঝা যায় যে, যে ব্যক্তি নিজের সঙ্গে কথা বলে সে বেশি বুদ্ধিমান। তবে, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে নিজের সঙ্গে কথা বললে মনোযোগ এবং কাজের ব্যবস্থাপনা উন্নত হয়। কিন্তু, এটি কেবল তখনই সত্যি যখন আপনি নিজের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কথা বলেন। নেতিবাচক স্ব-কথোপকথন মানসিক চাপ কমানোর পরিবর্তে তা বাড়িয়ে দেবে। আপনার মনে “আমি কিছুই করতে পারি না” বা “আমি সবসময় ব্যর্থ হই”-এর মতো চিন্তা গেঁথে যেতে পারে।
নিজের সঙ্গে কথা বলা মানেই মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ নয়, কিন্তু যদি আপনি এমন কণ্ঠস্বর শোনেন যার কোনও অস্তিত্ব নেই, ক্রমাগত আদেশ দেন, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করেন, অথবা বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে পার্থক্য করতে না পারেন, তাহলে আপনার একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
