সন্দীপ সরকার, কলকাতা: প্রথম ইনিংসের আয়ু ছিল ৩৬.৫ ওভার। দ্বিতীয় ইনিংসের মেয়াদ সামান্য বেশি। ৫৪.৪ ওভার। সব মিলিয়ে ইডেনে রঞ্জি ট্রফির ম্যাচে মহারাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দুই ইনিংস মিলিয়ে বাংলা ব্যাট করল ৯১.৩ ওভার। যেখানে মহারাষ্ট্রের শুধু প্রথম ইনিংসের মেয়াদই ছিল ৮২.৫ ওভার। দ্বিতীয় ইনিংসে কোনও উইকেট না হারিয়ে ১৯.৪ ওভারে লক্ষ্যপূরণ পৃথ্বী শ-দের।
ঘরের মাঠে মহারাষ্ট্রের কাছে বাংলার ১০ উইকেটে হারের ময়নাতদন্তে বসলে উঠে আসছে ব্যাটিংয়ের কঙ্কালসার ছবি। ৪ ম্যাচের ৮ ইনিংসে বাংলার স্কোর মাত্র দুবার দুশোর গণ্ডি পার করেছে! ইডেনে প্রথম ইনিংসে ১৪৩ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলা তোলে ১৮৬।
ব্যাটারদের পরিসংখ্যানও কপালে ভাঁজ পড়ার মতো। রেকর্ড বলছে, বাংলার হয়ে এই মরশুমে রঞ্জি অভিষেক ঘটানো ২৯ ছুঁই ছুঁই বয়সের অঙ্কুর পাল ৪ ম্যাচের ৮ ইনিংসে করেছেন ১৮৫ রান। গড় ২৩.১২। সর্বোচ্চ ৬৬। বারবার অহেতুক ঝুঁকি নিতে গিয়ে আউট হচ্ছেন। লাল বলের ক্রিকেটে ক্রিজে অন্তত প্রথম ঘণ্টা টিকে থাকাই যেখানে ওপেনারদের সাফল্যের প্রাথমিক শর্ত, সেখানে অ্যাডভেঞ্চার করে বেড়াচ্ছেন অঙ্কুর।
রঞ্জি ট্রফিতে গত মরশুমে অন্ধ্র প্রদেশের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ থেকে দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে কাটাচ্ছেন প্রায় ৩৫ বছরের সুদীপ চট্টোপাধ্যায়। বারাসতের বাঁহাতি ক্রিকেটারের রঞ্জি ট্রফিতে শেষ ১০ ইনিংসে করেছেন ৬৫ রান! সর্বোচ্চ ৩৪! মহারাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দুই ইনিংসে করলেন ৭ ও ০। আত্মবিশ্বাস তলানিতে। সোজা ব্যাটে খেলতেই পারছেন না।
অধিনায়ক অভিমন্যু ঈশ্বরণ ৮ ইনিংসে করেছেন ২৩০ রান। সর্বোচ্চ ৫৬। গড় ৩২.৮৬। যা তাঁর কেরিয়ারের পরিসংখ্যানের আশেপাশেও নেই। সবচেয়ে উদ্বেগের খবর, বারবার স্লিপ কর্ডনে খোঁচা দিচ্ছেন।
সুদীপ কুমার ঘরামি দিল্লির বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছিলেন। পরের ৩ ম্যাচে তাঁর সর্বোচ্চ স্কোর ৩৮। টপ অর্ডারের ব্যর্থতা লোয়ার মিডল অর্ডারের ওপর ভয়ঙ্কর চাপ তৈরি করছে। নীচের দিকে শাহবাজ আমেদ রান পেলে বাংলা জিতছে। মহারাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তা না হওয়ায় তলিয়ে গেল।
একমাত্র ইতিবাচক অভিষেক পোড়েল। প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছিলেন। ইডেনে কঠিন পরিস্থিতিতে দুই ইনিংসে হাফসেঞ্চুরি। ম্যাচের শেষে আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, ‘দু-একটা বড় পার্টনারশিপ হলে ম্যাচের ফল অন্যরকম হতো।’
ইডেনে ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণ কী? অদ্ভুত কথা বলে গেলেন দলের সহকারী কোচ সুরেন্দ্র ভাবে। বললেন, ‘আমি অজুহাত দেব না। তবে ইডেনে প্রথম ইনিংসে আমরা টস হেরে প্রাণবন্ত উইকেটে ব্যাট করতে বাধ্য হয়েছিলাম। দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা ব্যাট করতে নামার আগে বৃষ্টির জন্য পিচ সাড়ে তিন-চার ঘণ্টা ঢাকা ছিল। তাই বাইশ গজে স্যাঁতস্যাঁতে ভাব ছিল। সেই কারণেই এই ব্যর্থতা।’
অধিনায়ক অভিমন্যুও ব্যাটিং ব্যর্থতার কথা মানলেন না। বললেন, ‘টানা তিন ম্যাচ জেতার পর একটা ম্যাচে এরকম হতেই পারে।’ কিন্তু জেতা ম্যাচেও তো দিল্লির বিরুদ্ধে দ্বৈরথ বাদ দিলে বাকি সর্বত্র ব্যাটিং ধস দেখা গিয়েছে? অভিমন্যু যুক্তি দিলেন, ‘পালামে সার্ভিসেসের বিরুদ্ধে কিংবা মঙ্গলাপুরমে কেরলের বিরুদ্ধে পিচে ব্য়াটিং সহজ ছিল না। ঘূর্ণি উইকেটে খেলতে হয়েছে।’
বাংলার কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্ল দলের ব্যাটিং দেখে হতাশ। ব্যাটারদের কোথায় সমস্যা হচ্ছে অনুধাবন করার চেষ্টা করছেন। বললেন, ‘আমরা ভাল খেলতে পারিনি। তবে এই দল ঘুরে দাঁড়াবে। এখান থেকে আমরা চ্যাম্পিয়নও হতে পারি।’
প্রশ্ন থাকছে ব্যাটিং অর্ডার নিয়েও। ছন্দে থাকা সুমন্ত গুপ্তকে এই ম্যাচে দুই ইনিংসে নামানো হল আট নম্বরে। সূরয সিন্ধু জয়সওয়ালকে খেলানো হল মিডল অর্ডারে। যা নিয়ে সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও খুব খুশি বলে শোনা গেল না। রঞ্জি ট্রফিতে আপাতত আড়াই মাসের বিরতি। বাংলার পরের ম্যাচ পরের বছর ১৭ জানুয়ারি, গুজরাতের বিরুদ্ধে। তার আগে ব্যাটিং রোগ সারানোর দাওয়াই খুঁজতে হবে বাংলা শিবিরকে।
আরও পড়ুন: আড়াই বছর পর ইডেনে লজ্জায় ডুবল বাংলার ক্রিকেট, বোনাস পয়েন্ট সহ জিতে গ্রুপ শীর্ষে পৃথ্বীরা
