Last Updated:
Dooars Unique Puja Rituals: আশ্বিন মাসের প্রথম দিনেই ডুয়ার্সের ছোট্ট গ্রাম রামসাইয়ে পালিত হয় এক অনন্য হাতি পুজো। বছরের এই বিশেষ দিনে হাতিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও পুজোর নানা আচার দেখতে ভিড় করেন বহু মানুষ। ডুয়ার্সের প্রকৃতি ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই অভিনব পুজো কেন এত বিশেষ, কীভাবে পালিত হয় এবং এই বিরল রীতি দেখতে কোথায় যেতে হবে—জেনে নিন বিস্তারিত।
জলপাইগুড়ি, সুরজিৎ দে: রাত পোহালেই বিশ্বকর্মা পুজো। বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে ডুয়ার্সের এই গ্রামে রয়েছে অভিনব রীতি। কর্মের দেবতার পুজোর সঙ্গে পূজিত হন ‘মহাকাল’। কারণ খুঁজলে জানা যায় ফসল বাঁচাতে হাতিকেই ‘মহাকাল’ রূপে পুজো করেন স্থানীয় কৃষকরা। চারদিকে যখন কলকারখানা আর যন্ত্রের দেবতা বিশ্বকর্মার আরাধনায় মুখরিত বাংলা, ঠিক তখনই জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ির জঙ্গল লাগোয়া জনপদে দেখা যায় এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি। বিশ্বকর্মা পুজোর দিনেই পরম ভক্তিভরে করা হয় ‘মহাকাল বাবা’র পুজো। স্থানীয়দের অটুট বিশ্বাস, যিনি স্বয়ং বনের ঐরাবত বা হাতি, বছরের পর বছর ধরে এই বিশেষ দিনে তাকেই জাগ্রত দেবতা জ্ঞানে পুজো করে আসছেন গরুমারা জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন রামশাই-এর বাসিন্দারা।
ময়নাগুড়ি ব্লকের রামশাই গ্রাম পঞ্চায়েতের কাওয়াগাবাড়ি ও চ্যাংমারির মতো বনাঞ্চল ঘেরা গ্রামগুলিতে মহাকাল পুজো এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। শাস্ত্রমতে, এই পুজোর নির্দিষ্ট কোনও তিথিও নেই। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে কেউ বৈশাখে আবার কেউ মাঘ মাসে এই পুজো করেন। তবে রামশাইয়ের এই বিস্তীর্ণ এলাকায় বিশ্বকর্মা পুজোর দিনেই ‘মহাকাল’বাবার থানে পুজো দেওয়ার চিরাচরিত রীতি চলে আসছে।
শুধুই এই অভিনব রীতি মেনে এই পুজো তেমনটা নয়, এখানকার মূর্তির রূপও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশাল এক হাতির পিঠে রাজবেশে আসীন এক পুরুষের প্রতিকৃতি। স্থানীয় সংস্কৃতিতে যা বন্যপ্রাণ ও প্রকৃতির এক যৌথ শক্তির প্রতীক। গরুমারা জঙ্গল সীমানার এই জনপদের অধিকাংশ মানুষেরই রুটিরুজি নির্ভর করে কৃষিকাজের ওপর। কিন্তু বছরের বিভিন্ন মরশুমে জঙ্গল ছেড়ে হাতির দল লোকালয়ে হানা দিয়ে বিঘার পর বিঘা ধান ও ভুট্টার খেত নষ্ট করে দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাটির ঘরবাড়িও। বুনো হাতির সেই তাণ্ডব থেকে বাঁচতেই ভয় আর শ্রদ্ধার এক অদ্ভুত মেলবন্ধনে গ্রামবাসী হাতিকে দেবতার আসনে বসিয়েছেন। তাঁদের বিশ্বাস, নিষ্ঠাভরে ‘মহাকাল’বাবার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলে গজরাজ শান্ত থাকবে এবং কষ্টের ফসলে পা দেবে না।
কাওয়াগাবাড়ির প্রবীণ বাসিন্দা কৃষ্ণ রায় জানান, হাতি ও মহাকালের উপাসনা তাঁদের জনজীবনে নতুন কোনও পর্ব নয়। বংশ পরম্পরায় বন্যপ্রাণের সঙ্গে সহাবস্থানের এই গভীর আবেগ, বিশ্বাস, ঐতিহ্য মিশে রয়েছে তাঁদের রক্তে। তাই আধুনিকতার যুগেও লোকবিশ্বাস আর প্রকৃতির সঙ্গে সন্ধি করে বেঁচে থাকার এই অনন্য ছবি ডুয়ার্সের বুকে আজও জীবন্ত।
