নয়াদিল্লি: বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, উজ্জ্বল উপস্থিতি। বাচনভঙ্গি এমন যে রাজনৈতিক ভাষণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত কথোপকথন। আমেরিকার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ সেনেটর জন অসফ। তবে এখন থেকেই তাঁকে ‘লম্বা রেসের ঘোড়া’ বলে অভিহিত করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কেউ কেউ আবার ভবিষ্যতের বারাক ওবামাও বলতে শুরু করেছেন তাঁকে। (Jon Ossoff)
সামান্য ব্যবধানে জিতে ২০২১ সালে প্রথম বার জর্জিয়া থেকে সেনেটে প্রবেশ করেন জন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৩ বছর। সেই কারণে ‘অ্যাক্সিডেন্টাল সেনেটর’ কটাক্ষও শুনতে হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে মিডটার্ম নির্বাচনে ওই আসন যেভাবে ধরে রাখলেন তিনি, তাতে কার্যতই মুখ বন্ধ হয়ে গিয়েছে নিন্দুকদের। (Next Barack Obama)
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জর্জিয়ার মানুষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু দু’বছরের মাথায় পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে পুরোপুরি। জর্জিয়ার ভোটারদের ৬০ শতাংশই তাঁকে ভোট দিয়েছেন। আর তাতেই আমেরিকার ভাবী প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁকে দেখতে শুরু করেছেন অনেকে।
এর আগে, একাধিকবার জনকে বলতে শোনা যায় যে, প্রেসিডেন্ট হওয়ার তেমন আকাঙ্খা নেই তাঁর। কিন্তু ডেমোক্র্যাট শিবিরের নতুন প্রজন্মের নেতাদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট পদের দাবিদার হিসেবে অনেকের চেয়েই এগিয়ে রয়েছেন জন। তাঁর মধ্যে ওবামাকে দেখতে শুরু করেছেন অনুগামীরাও।
১৯৮৭ সালে আটলান্টায় জন্ম জনের। তাঁর মা অস্ট্রেলীয় অভিবাসী। তাঁর বাবা বেলারুশের ইহুদি অভিবাসী পরিবারের সন্তান। জনের পরিবার এবং আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই নাৎজিদের হাতে অত্যাচারের শিকার হন। প্রাণে বাঁচতে দেশছাড়া হতে হয় তাঁর দাদু-ঠাকুমাকেও। কিন্তু ইহুদি ধর্মাবলম্বী হয়েও ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ঘোর সমালোচক জন। আমেরিকাকে যুদ্ধে ঠেলে দেওয়ার জন্য তীব্র নিন্দা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও।
বুধবার রাতে জয় হাসিলের পরও ট্রাম্পকে নিশানা করেন জন। বলেন, “উনি একজন ব্যর্থ, ঠুঁটো প্রেসিডেন্ট। আমেরিকার মানুষ ওঁর খামখেয়ালিপনা, দুর্নীতি এবং অযোগ্যতাকে প্রত্যাখ্য়ান করেছেন। প্রেসিডেন্টের অপকর্মকে সীমাবদ্ধ রাখা নয় শুধু, বরং গভীরে লুকিয়ে থাকা ক্ষতগুলিকে সারিয়ে তোলার চেষ্টাই চালিয়েছি আমরা গত দু’বছর ধরে।”
তবে হঠাৎ করে রাজনীতিতে এসে পড়েননি জন। কৈশোরেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন তিনি। ১৭ বছর হয়সে জন লুইসের আত্মজীবনী পড়ে এতটাই উদ্বুদ্ধ হন যে, তাঁকে চিঠিও লেখেন, একসঙ্গে কাজ করতে চেয়ে আবেদন জানান। ছোট্ট জনকে ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেন লুইস। ঘটনাচক্রে ওবামার রাজনৈতিক কেরিয়ারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন লুইস।
২০০৯সালে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক হন জন। এর পর লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিকসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করতে যান। জর্জিয়ার কংগ্রেসম্যান হ্যাঙ্ক জনসনের সঙ্গে কিছুদিন কাজের অভিজ্ঞতা হয়। বৈদেশিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে হাতেকলমে শিক্ষা অর্জন করেন। এর পর তদন্তমূলক সাংবাদিকতা এবং তথ্যচিত্র তৈরিতেও হাত পাকান জন। ২০১৩ সালে লন্ডনের Insight TWI সংস্থার সিইও হন, যেখানে দুর্নীতি, যুদ্ধাপরাধ, মানবপাচার নিয়ে অনুসন্ধানমূলক তথ্যচিত্র তৈরি হতো। ২০১৭ সালে ওই সংস্থা ছেড়ে সর্বক্ষণের রাজনীতিক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জন। গোড়ার দিকে স্থানীয় স্তরের নির্বাচনেই নাম লেখান। তবে তেমন সাফল্য পাননি। ২০২১ সালে একেবারে সেনেটর নির্বাচিত হন।
মাত্র ১০ বছরের মধ্যেই নিজেকে প্রেসিডেন্ট পদের দাবিদার হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছেন জন। তাঁর মধ্যে ওবামাকে দেখতে পান অনেকেই। ওবামার মতোই প্রগতিশীল, মধ্যপন্থী রাজনীতিক জন। প্রবীণ রাজনীতিকদের মধ্যে তরুণ প্রতিভা হিসেবে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ২০০৯ সালে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল ওবামার ক্ষেত্রে। ৬২ বছর বয়সি জর্জ বুশের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে বাজিমাত করেছিলেন ৪৭ বছর বয়সি ওবামা। দু’জনের ভাবমূর্তি, জীবনশৈলীও মিলে যায়। ওবামার মতোই দক্ষ বক্তা জন। একই ভঙ্গিতে শার্টের হাতা গুটিয়ে ভাষণ দেন। আমেরিকার সাংবাদিক এজরা কুইন ‘নিউ ইয়র্ক টাইমসে’ লেখেন, ‘জনের কথা বলার ভঙ্গি, যেভাবে নিজেকে পেশ করেন তিনি, তা ওবামার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়’।
এমনকি ভোটারদের অনেকেও জনের সঙ্গে ওবামার মিল খুঁজে পান। ভোট দিতে যাওয়ার সময় জর্জিয়ার ভোটার প্য়াট্রিক গার্ভার বলেন, “২০ বছর আগে ওবামাকে দেখে যে অনুভূতি হতো, ঠিক তেমনই অনুভূতি হয় জনকে দেখে।” এমনকি জর্জিয়ায় প্রচারে গিয়ে ওবামাও জনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁকে বলতে শোনা যায়, “”
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি নিজেই মধ্যবর্তী মেয়াদের আগে একটি প্রচার সমাবেশে ওসফের প্রশংসা করেছিলেন। ওবামা বলেন, “জন অত্যন্ত জ্ঞানী। সাধারণ বোধবুদ্ধি প্রখর ওঁর। আমার মেন্টর জন লুইসের কাছ থেকেই শিক্ষা পেয়েছেন উনি। ভাল জিনিস তৈরিতে দক্ষ লুইস।”
ওবামার সঙ্গে তুলনায় জনকে কটাক্ষ করে হোয়াইট হাউসও। জনকে ‘বিরক্তিকর’, ‘মেয়েলি’ বলে কটাক্ষ করা হয়। পাল্টা জবাব দিতে করেননি জন। দ্বিতীয় বার জর্জিয়া থেকে জয়ী হওয়ার পর এই মুহূর্তে সরাসরি ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন তিনি। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা তাঁকে এগিয়ে দিতে পারেন বলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।
Strait of Hormuz: ভারতের জন্য সুখবর! পণ্যবাহী জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালী খুলল ইরান
